Tuesday, July 21, 2026
spot_imgspot_img

জনপ্রিয় খবর

spot_img

Related Posts

ঋত্বিক ঘটক: বাঙালির এক আজন্ম ভবঘুরে সিনেমাওয়ালা

ঋত্বিক কুমার ঘটক মনেপ্রাণে কতটা তীব্রভাবে বাঙালি ছিলেন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের সেই অকপট সাক্ষ্য—‘ঋত্বিক আমার থেকেও অনেক বেশি বাঙালি।’ পুরান ঢাকার ঋষিকেশ দাস লেনে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি ছেলেবেলা থেকেই আর দশজন সাধারণ কিংবা বিখ্যাত লোকের মতো ছিলেন না। জীবনকে তিনি নিজের মতো করে গড়েছেন আর ভেঙেছেন। রাজনীতি, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ, গণনাট্যের কাজ, নাটক লেখা ও অভিনয়—সবকিছু ছাড়িয়ে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি বাংলা ও বাঙালির এক কালজয়ী ‘সিনেমাওয়ালা’।

কলকাতার চায়ের দোকান ‘প্যারাডাইস ক্যাফে’ ছিল ঋত্বিকের আড্ডা ও রাজনৈতিক-চলচ্চিত্র ভাবনার সূতিকাগার, যেখানে মৃণাল সেন, সলীল চৌধুরীদের মতো তরুণদের মধ্যমণি ছিলেন তিনি। ঋত্বিক চলচ্চিত্রে এসেছিলেন মূলত নাটক বা সাহিত্যের চেয়ে সিনেমা একসঙ্গে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দেয় বলে। তাঁর প্রথম নির্মিত সিনেমা ‘নাগরিক’ (১৯৫২) বিশ্বযুদ্ধোত্তর বাঙালি মধ্যবিত্তের জীবনের টানাপোড়েনের এক নিরেট গল্প হলেও, অর্থাভাবের কারণে তা মুক্তি পায় পরিচালকের মৃত্যুর পরে, ১৯৭৭ সালে।

এরপর ১৯৫৮ সালে মুক্তি পায় তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি ‘অযান্ত্রিক’। মানুষ ও যন্ত্রের (ট্যাক্সি ‘জগদ্দল’) ভালোবাসার এই পরাবাস্তব ও সাহসী গল্প ঋত্বিককে এনে দেয় তুমুল খ্যাতি। এরপর একে একে মুক্তি পায় ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’, এবং দেশভাগের যন্ত্রণা ও শরণার্থী সমস্যা নিয়ে তাঁর বিখ্যাত ত্রয়ী সিনেমা—‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘কোমল গান্ধার’ ও ‘সুবর্ণরেখা’। দেশভাগ এবং নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার হাহাকার ঋত্বিককে আজীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছিল, যার প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর সৃষ্টিতে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে তিনি ‘দুর্বার গতি পদ্মা’ নামের চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন।

অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে শুটিং করা ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সিনেমায় নদীপাড়ের মালোপাড়ার জীবনপ্রবাহকে তিনি অসাধারণ নৈপুণ্যে ফুটিয়ে তোলেন। আর তাঁর শেষ সিনেমা ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ ছিল মূলত ঋত্বিকের নিজেরই এক ‘সেলফ পোর্ট্রেট’। এই সিনেমার মূল চরিত্র নীলকণ্ঠের বেশে ঋত্বিক নিজেই যেন নিজেকে ধরে ধরে নির্মোহ বিশ্লেষণ করেছেন এবং দর্শককে বুনে দিয়েছেন তাঁর বিখ্যাত সংলাপ—‘ভাবো, ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।’

ঋত্বিকের ক্যামেরায় সমকালীন সংকট, দারিদ্র্য ও মানুষের অবক্ষয় বারবার উঠে এলেও, তিনি সবসময় বিশ্বাসের রাখতেন জীবনের প্রবহমানতায়। তাই তাঁর চরিত্ররা মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও জীবনের জয়গান গাইত। জীবদ্দশায় চরম অর্থকষ্ট, অবহেলা আর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করা এই খাঁটি শিল্পী ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৫০ বছর বয়সে মারা যান। মৃত্যুর এত বছর পরেও নিজের কালজয়ী সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি আজও বাঙালিকে অনবরত ‘ভাবার প্র্যাকটিস’ করিয়ে চলেছেন।

Popular Articles