১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, ঢাকার ইস্কাটন এলাকার একটি ফ্ল্যাটে জনপ্রিয় অভিনেতা সালমান শাহকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর এমন মৃত্যু গোটা দেশকে স্তম্ভিত করে তোলে।
বহু বছর ধরে তাঁর বাবা কামরুদ্দিন চৌধুরী ও মা নীলা চৌধুরী দাবি করে আসছেন—সালমান আত্মহত্যা করেননি, তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
বছরের পর বছর তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধার কারণে, অনুসন্ধান ঘুরেছে ‘আত্মহত্যা’ ও ‘হত্যা’—এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ২০২০ সালে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে জানায়, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও মানসিক চাপে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।
তবে সালমানের পরিবার এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে মামলার পুনঃতদন্তের দাবি জানায়।
সেই তদন্তের ধারাবাহিকতায় সালমান শাহর মৃত্যু নিয়ে উঠে এসেছে ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, যেগুলো এখনও স্পষ্ট জবাব পায়নি—
১. সালমানের দেহ ঝুলন্ত অবস্থায় কেন প্রথমে প্রতিবেশী বা পুলিশকে দেখানো হয়নি?
২. আবুলের উপস্থিতিতে কেন কাজের মহিলা বঁটি দিয়ে রশি কাটতে গেলেন?
৩. কেন সালমানের জিহ্বা বের হয়নি?
৪. সারারাত ব্যবহারের পর তাঁর শর্টস কীভাবে ধবধবে নতুন ছিল?
৫. দড়িতে ঝুলে পড়ার পরও কিভাবে দীর্ঘক্ষণ প্রাণ থাকতে পারে?
৬. তাহলে কেন তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের কাছে নেওয়া হয়নি?
৭. কেন তাঁকে মেঝেতে রেখে পানি ঢালা ও তেল মালিশ করা হয়েছিল?
৮. মৃত্যুর দিন ভোরে নিরাপত্তাকর্মী খালেক কেন বড় তিন-চারটি লাগেজ নিয়ে গেলেন?
৯. মৃত্যুর আগের দিন ও পরের দিন উদ্ধার হওয়া ভাঙা ফ্যানের রঙ কেন ভিন্ন ছিল?
১০. ফোনের সঙ্গে থাকা আনসারি মেশিনটি কোথায় গেল?
১১. মৃত্যুর সকালে কেন সালমানের বাবাকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি?
১২. কেন বাবাকে (কামরুদ্দিন চৌধুরী) ফ্ল্যাটে ঢুকতে অনুমতি নিতে হয়েছিল?
১৩. অনুরোধ সত্ত্বেও সামিরা কেন লাশের সঙ্গে যায়নি?
১৪. সামিরার মা লুসি কেন মৃত্যুর দুদিন আগে ঢাকায় এলেন?
১৫. কাজের মহিলা ও সালমানের সহকারী আবুল কেন সামিরার পরিবারের জিম্মায়?
১৬. অসুস্থ অবস্থায় সামিরা কেন একবারও দেখতে আসেননি?
১৭. মৃত্যুর পর সালমানের স্যুটকেসে কেন পাওয়া গেল ভেজা কাপড়, সিরিঞ্জ ও খালি অ্যাম্পুল?
১৮. তাঁর ফ্ল্যাটে অসংখ্য তাবিজ ও চিনিপোড়া কেন পাওয়া গেল, যা বশীকরণের কাজে ব্যবহৃত হতো বলে অভিযোগ?
১৯. সামিরার লেখা হুমকিমূলক চিঠিগুলোর তদন্ত হলো না কেন?
২০. সুমিতকে বিয়ে করার হুমকি ও রটনা কেন উঠেছিল?
২১. রাতে বাইরে থেকে সিটকানি আটকিয়ে ১/বি ফ্ল্যাটে সামিরা কেন গিয়েছিলেন?
২২. মৃত্যুর পর লাশ মেঝেতে রেখে সামিরা ও রুবির গল্প করার কারণ কী?
২৩. এর আগে স্বর্ণচুরির ঘটনায় কাজের মহিলার স্বীকারোক্তি কেন গুরুত্ব পেল না?
২৪. মৃ*ত্যুর আগের দিন রাতে ভাঙা ফ্যান এবং পরে উদ্ভারকৃত ভাঙা ফ্যানের রঙ এক নয়?
এই প্রশ্নগুলোর ভিত্তিতে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বর্তমানে মামলায় ১১ জন অভিযুক্ত রয়েছেন—তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সালমানের স্ত্রী সামিরা হক, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই এবং অভিনেতা ডনসহ আরও কয়েকজন।
দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকা আদালত মামলাটিকে ‘হত্যা মামলা’ হিসেবে পুনরায় কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে।
২৯ বছর পর এখন মূল প্রশ্ন একটাই, এই ২৪টি প্রশ্নের উত্তর কি মিলবে? তদন্ত কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হবে? আর শেষ পর্যন্ত, সালমান শাহর পরিবার কি ন্যায়বিচার পাবে?


