Monday, March 2, 2026
spot_imgspot_img

Top 5 This Week

spot_img

Related Posts

ফেলদুাকে নিয়ে নতুন ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’

এই ধাঁধা রহস্য সমাধান নিয়েই সিনেমা। ফেলুদার কথা মনে পড়ছে তো? মনে পড়ারই কথা। ফেলুদাকে শ্রদ্ধার্ঘ্য জানিয়েই যত কাণ্ড কলকাতাতেই বানিয়েছেন অনীক দত্ত; যেখানে সিনেমার অন্যতম প্রধান চরিত্রের নাম আবার তোপসে!

গল্পের প্রধান চরিত্র সাবা (কাজী নওশাবা আহমেদ)। ঢাকার এই তরুণী নিজের শিকড় খুঁজতে হাজির হন কলকাতায়। পেয়ে যান বহু আগে তাঁর পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া এক খাম। যেখানে আছে দুর্বোধ্য এক ধাঁধা। এই রহস্য-জট সমাধানে পাশে পান তোপসেকে (আবীর চট্টোপাধ্যায়)। কলকাতার অলিগলি হয়ে দার্জিলিং পর্যন্ত চলে খোঁজাখুঁজি। বুদ্ধিদীপ্ত রহস্য, নস্টালজিয়ায় ভরা ফ্ল্যাশব্যাক আর আধুনিক সময়ের নানা মোচড়ে নির্মিত ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ শুধু একটি হুডানিটই নয়; বরং শহর কলকাতাকে উদ্‌যাপনের এক চেষ্টা, যেখানে শহর নিজেই হয়ে ওঠে জীবন্ত এক চরিত্র।

পরিচালক অনীক দত্তর সিনেমায় কলকাতা বরাবরই শুধু পটভূমি নয়। একের পর এক ছবিতে তিনি যেন বারবার শহরটির কাছে ফিরে আসেন, ঠিক যেন কলকাতাই তাঁর গল্পের নায়ক। এ ছবিতে এসে সেই ঝোঁক আরও স্পষ্ট। এখানে কলকাতাকে তিনি সরাসরি প্রধান চরিত্রের আসনে বসিয়েছেন—ডিটেকটিভ গল্পের ছদ্মবেশে। যেখানে সর্বত্র স্নেহভরে ঘুরে বেড়ায় সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদার ছায়া। অনীক দত্ত সত্যজিতের রহস্যের ধাঁচে নিজের মতো করে গল্প বলেছেন, যেখানে অপরাধ বা যুক্তির চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে স্মৃতি, ঐতিহ্য আর শহরের ইতিহাস। এই ঝুঁকি আংশিকভাবে সফল।এটি না টান টান থ্রিলার, না নিছক নস্টালজিয়ার সফর; বরং দুইয়ের মিশেল।

শুরু থেকে ছবিকে টেনে নিয়ে যান সাবা, অনেকটা পরে যুক্ত হন তোপসে। এই জুটি শুরু করেন দুই প্রজন্মজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক ধাঁধার অনুসন্ধান। সূত্রের খোঁজ মেলে সেন্ট জনস চার্চের কবরস্থান, ঝাপসা পুরোনো ছবি, অনলাইন পোস্ট, গুগল সার্চে ফেলুদার চেনা ব্যাকরণের সঙ্গে যুক্ত হয় আধুনিক সময়ের মজা। এখানে রহস্যের চিঠির জায়গা নেয় ফেসবুক পোস্ট। সংলাপগুলো চটপটে ও বুদ্ধিদীপ্ত, ফেলুদাসুলভ রসিকতায় ভরপুর, যা মূল সিরিজের ভক্তদের আনন্দ দেবে।

তবে প্রথম ভাগে টান টান হলেও পরের অংশে গিয়ে সিনেমাটি বারবার গতিমন্থরতায় ভোগে। মনে হয়, দৈর্ঘ্য অনায়াসেই আরও কমানো যেত। ছবির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা এর পূর্বানুমেয়তা। ধাঁধাগুলো ভাবনায় চতুর হলেও কিছু মোচড় আগেভাগেই আন্দাজ করা যায়, কিছু দৃশ্য বিশ্বাসযোগ্যতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা চিত্রকর্ম-সংক্রান্ত রহস্য ভাবনায় দারুণ হলেও বাস্তবায়নে খানিকটা হোঁচট খায়।

গল্প যেখানে দুর্বল, সেখানে নির্মাণশৈলী ছবিটিকে টেনে তোলে। চিত্রগ্রাহক সৌম্য রায়ের ক্যামেরায় কলকাতা ধরা পড়েছে গভীর মমতায়—কখনো নস্টালজিক গাম্ভীর্যে, কখনো ব্যস্ত আধুনিকতায়। গির্জা, কবরস্থান, পার্ক স্ট্রিট, পুরোনো বাড়ি, আঁকাবাঁকা রাস্তা—সবই ভালোবাসায় ফ্রেমবন্দী, যেন শহরটাই একেকটি ধাঁধা। কার্সিয়ং আর দার্জিলিংয়ের কুয়াশামাখা দৃশ্যে গল্প ঘুরে বেড়ালেও মূল থিম থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।

ছবির প্রধান চরিত্রে কাজী নওশাবা আহমেদ দারুণ। পুরো কাহিনি মূলত তাঁর অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত; সেটা ভালোভাবেই সামলেছেন বাংলাদেশি অভিনেত্রী। আফসোস, দেশের নির্মাতারা তাঁকে নিয়ে সেভাবে ভাবেন না। আবীর চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় শান্ত, পরিণত ও বিশ্বাসযোগ্য, যেন সত্যিই ফেলুদার ছায়া পেরিয়ে একজন গোয়েন্দা হিসেবে বড় হয়ে উঠেছেন। অন্যান্য চরিত্রে রোজা পারমিতা দে, ঋক চট্টোপাধ্যায়, দুলাল লাহিড়ি যোগ্য সংগত দিয়েছেন।

ফেলুদার প্রতি অনীক দত্তর ভালোবাসা পুরো ছবিতেই স্পষ্ট। কবরস্থান, ধাঁধার কাঠামো, যুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান, এমনকি সম্পাদনা আর সংলাপেও সত্যজিৎ রায়ের জগতের ইঙ্গিত ছড়িয়ে আছে। যাঁরা ফেলুদা পড়ে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে এসব মুহূর্ত ছোট ছোট উপহার। নতুন দর্শকের চোখে সেগুলো চোখ এড়ালেও ছবিটি তখনো কাজ করে—একটি শহরকে নিয়ে ভাবনার চলচ্চিত্র হিসেবে। এখানে কলকাতাই আসল রহস্য—গোপন কথা, ছায়া আর মুছে না যাওয়া স্মৃতির শহর।

দেবজ্যোতি মিশ্রর আবহসংগীত যেন ছবির আত্মা। উত্তেজনা ধরে রাখা, নস্টালজিয়ার স্তর তৈরি করা, আবেগের ভিত গড়ে তোলা—সবকিছুতেই সংগীত অনিবার্য। রেট্রো জ্যাজ, লোকসুর আর অর্কেস্ট্রাল মেলবন্ধনে তৈরি হয়েছে এমন এক সাউন্ডস্কেপ, যা কলকাতা থেকে আলাদা করা যায় না। তানিয়া সেনের ‘নাইটক্লাব’ গানটি আলাদা করে নজর কাড়ে—ফিরিয়ে আনে ষাটের দশকের ক্যাবারে মেজাজ। অনিন্দ্য-উপল, অর্ক মুখার্জির গানগুলোও মন্দ নয়। চিত্রনাট্য যেখানে হোঁচট খায়, সংগীত সেখানেই ছবিটিকে বাঁচিয়ে রাখে।

‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ রহস্য সিনেমা হিসেবে নতুন কিছু যোগ করে না কিন্তু ফেলুদা-যোগ, নস্টালজিয়া, কলকাতার পটভূমি আর অভিনয় মিলিয়ে একবার দেখার জন্য খারাপ নয়।

Popular Articles